Upcoming Events

No upcoming events.

সম্পদ লুন্ঠন ও পাচার

প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আহ্বায়ক

আমাদের মত দরিদ্র ও দুর্বল দেশে সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলি তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ধনিক শ্রেনীর বিকাশ ঘটায় ও তাদের সহযোগিতায় দেশের জ্বালানী ও মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন ও পাচার করে। এভাবে তাদের নিজেদের জ্বালানী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন করে এবং লুন্ঠিত দেশের জ্বালানী ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ধ্বংস করে। এই ধনিক শ্রেনীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে দেশের শাসনভার গ্রহন করে এবং সাম্রাজ্যবাদের জন্য দেশের জ্বালানী ও অন্যান্য মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠনের এবং পাচারের দ্বার অবারিত করে দেয়। দেশে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির জন্ম দেয়। যার ফলে দেশপ্রেমিক জাতীয় সম্পদ ও স্বার্থ-রক্ষাকারী শক্তির বিকাশ ও তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কঠিন করে দেয়। আমাদের দেশেও সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় ধনিক শ্রেনীর সরকারগণ একই খেলা খেলছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে দেশের সম্পদ লুন্ঠন ও পাচার হয়েছে, দরিদ্র জনসাধারণের দুভের্াগ অতিমাত্রায় বেড়েছে, গ্যাস ও বিদু্যৎ এর ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের দেশে গত দশকে সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কোম্পানির কয়েকটি লুন্ঠণ/পাচার প্রকল্প ও তার বিরুদ্ধে সংগঠিত জাতীয় প্রতিরোধের বিবরণঃ ২০০৬ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বহুজাতিক কোম্পানী এশিয়া এনার্জিকে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির মাধ্যমে পারিবেশের ভয়াবহ সর্বনাশা চুক্তি করে মাত্র শতকরা ৬ ভাগ রয়্যালটির বিনিময়ে শতকরা ৯৪ ভাগ লুন্ঠন ও পাচারের ব্যবস্থা পাকাপাকি করেছিল। জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে প্রাণবাজী রেখে জনগণের সংগ্রামের ফলে এই চুক্তি সফল হতে পারে নাই। তখনকার বিরোধী দলনেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২৬ আগষ্ট ২০০৬ এর গণঅভূ্যত্থানের কয়েকদিন পর ফুলবাড়ীতে দাড়িয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলে দেশের কোথাও উন্মুক্ত খনি করতে দেবেন না। বর্তমানে ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার জন্য কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে পরিবেশের ক্ষতি হবে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য সমপ্রতি একজন এঙ্পার্ট নিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে একান্ত অনুগত এঙ্পার্ট এর মাধ্যমে সার্টিফিকেট জোগাড় করা যায় যে, পরিবেশের ক্ষতির পরিমান গ্রহনযোগ্যতার মাত্রা অতিক্রম করবে না এবং তারপর উন্মুক্ত খনি পদ্ধতি তথা কয়লা রফতানির পথ প্রশস্ত হবে। কি চাতুরী ! ইতিপূর্বে ২০০১ সালে বিবিয়ানা কূপ থেকে, এই পর্যন্ত আবিষ্কৃত মজুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিমান গ্যাস নাম মাত্র মূল্যে ভারতে পাচার করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু জাতীয় কমিটির লংমার্চ সহ জনগণের আন্দোলনের চাপে তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার এই লুন্ঠন ও পাচার থেকে বিরত থাকেন। কয়েক বছর পর আসেন ভারতের টাটা কোম্পানী, যাঁরা ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মূলা ঝুলিয়ে গ্যাসকে পণ্যে রুপান্তরিত করে গ্যাস লুন্ঠন ও পাচারের ষড়যন্ত্র করে। জাতীয় কমিটির আন্দোলনের ফলে টাটার এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। ২০০২ সালের চট্টগ্রাম বন্দরকে পঙ্গু বা ধ্বংস করে বন্দরের অদূরে ভাটিতে একটি প্রাইভেট কন্টেইনার পোর্ট স্থাপনের জন্য অবৈধভাবে রেজিস্ট্রিকৃত বহুজাতিক কোম্পানী ষ্টিভিডোর সার্ভিসেস অব আমেরিকা নামে বহুজাতিক কোম্পানীকে নিয়োগের জন্য সরকার উদ্যোগ নেন ও তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই চুক্তির জন্য অবিরাম চাপ দিতে থাকেন। চট্টগ্রামের সুশীল সমাজে এই প্রকল্পের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে তাঁদের সমর্থন আদায়ের জন্য পৌনপৌনিক চেষ্টা করতে থাকেন। আমাদের জাতীয় কমিটির উদ্যোগে লংমার্চ সহ জনগণের আন্দোলনের ফলে এই চক্রান্তও ব্যর্থ হয়। এই চক্রান্তের মধ্যে পোর্টে জেটির এক অংশে আমেরিকানদের একটি নৌ-সেনা ঘাটি স্থাপনের চক্রান্তও অন্তভর্ূক্ত ছিল। সর্বশেষ লুন্ঠণ তৎপরতাঃ বর্তমান সরকার গত নয় মাসের মধ্যেই পেট্রোলিয়াম সংস্থাকে চরম দুনর্ীতিগ্রস্ত বানিয়ে নিয়ে তাদের সহায়তায় তিনটি পৃথক লুন্ঠনের ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটিয়েছেন যথা

(১) পেট্রোবাংলাকে একটি নির্দিষ্ট দরে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বহুজাতিক কোম্পানী কেয়ার্নকে তৃতীয় যে কোন পক্ষের কাছে (বর্তমান গ্যাস সংকটের সুযোগে) বহুগুন বেশি দামে বিক্রয় করে আকাশচুম্বি মুনাফার সুযোগ করে দিয়েছে।

(২) বহুজাতিক কোম্পানী শেভরণকে ১২ ও ১৩ নম্বর ব্লকে বিনা প্রতিযোগিতায় বিরাট এলাকায় সাইজমিক জরিপ করার কাজ দিয়েছে, দুই দফায়, যা বিধি অনুসারে দেশের জাতীয় সংস্থা বাপেঙ্কে দেওয়া অবশ্যকর্তব্য ছিল।
(৩) সুনির্দিষ্ট বিধি লংঘন করে বিনা প্রতিযোগিতায় শেভরনকে ৫৫.৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গ্যাস পাইপ লাইনের চাপ বাড়ানোর জন্য কমপ্রেসার যন্ত্র সরবরাহ ও স্থাপনার কাজ দিয়েছে।

সাগরতলের তেল-গ্যাস সম্পদ লুন্ঠন ও পাচারের চলতি ষড়যন্ত্র ঃ বিগত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাম্রাজ্যবাদ ড. তামিম নামে এক অনুগত উপদেষ্টাকে নিয়োগের ব্যবস্থা করে অতি তাড়াতাড়ি সাগরের তেল-গ্যাস লুন্ঠন ও পাচারের জন্য মডেল পিএসসি- ২০০৮ প্রণয়ন করে। সাগর এলাকা ২৮টি ব্লকে ভাগ করে ২০০৮ ফেব্রুয়ারীতে দরপত্র আহ্বান এবং তিন মাস পরে দরপত্র গ্রহন করে। এত তাড়াতাড়ি করা হয় যাতে সেনাসমর্থিত অবৈধ সরকারের আমলে জনমতের তোয়াক্কা না করে এই জনস্বার্থ বিরোধী চুক্তি করে ফেলা যায়। যা হোক ৯টি ব্লকের দরপত্র পাওয়া যায় এবং তার ভিত্তিতে ২০০৮ এর অক্টোবর মাসে ২টি বহুজাতিক কোম্পানীকে নির্বাচন করা হয় এবং তাদের কাজ দেবার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর ঐ উপদেষ্টা পৌনপৌনিক ভাবে চাপ দিতে থাকে কিন্তু জাতীয় কমিটির প্রতিবাদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজ দিতে সাহস পাননি।

কিন্তু জনগণের বিরাট অংশের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক আমলের ড. তামিমের তড়িঘড়ি ও ভয়কে সম্পূর্ন অমূলক প্রমাণ করে ঐ সরকারের আমলে প্রণীত ভয়ঙ্কর জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদনের জন্য তাদের নির্বাচিত দুটি বহুজাতিক কোম্পানী যথা আমেরিকার কনোকোফিলিপসকে ১০ নং ও ১১ নং ব্লক আইরিশ কোম্পানী তাল্লোকে ৫নং ব্লকের চুক্তি সম্পাদনের সমপ্রতি আদেশ দিয়েছেন এই অক্টোবর মাসেই তা হয়ে যাবে আমরা রুখতে না পারলে। এই চুক্তি অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ গ্যাস পাবো, তবে কন্ট্রাক্টরের ৮০ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট দরে আমাদের কেনার অধিকার থাকবে। এই শর্ত একটি বিরাট চাতুরী এবং নিষ্ঠুর রসিকতা। কারণ, গ্যাস আমাদের দেওয়া হবে দেড়'শ মাইল দূরে গভীর সুমদ্রের কূপস্থলে বা পেট্রোবাংলা কতর্ৃক নির্দিষ্টকৃত মেজারিং পয়েন্টে। জাতীয় স্বার্থের সর্বনাশ করে বহুজাতিক কোম্পানীর স্বার্থ সাধন করার বেলায় যে পেট্রোবাংলা ইতিমধ্যে পারদর্শিতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তারাই বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে সাগর এলাকায় কূপের সনি্নকটেই করবেন যাতে বহুজাতিক কোম্পানির ব্যয় লঘু হয়, পক্ষান্তরে এই অবস্থানের মেজারিং পয়েন্ট থেকে কূল পর্যন্ত তেল-গ্যাস পরিবহন আমাদের আর্থিক বা কারিগরী সামর্থ্যের বাইরে হবে। ফলে আমাদের অংশ ও বহুজাতিক কোম্পানির কাছে ছেড়ে আসতে হবে এমন আশংকা করা যায়। অতএব প্রায় অনিবার্যভাবে শতভাগ তেল-গ্যাস তরলায়িত করে বহুজাতিক কোম্পানী সমুদ্র কূপ থেকেই পাচার করার সুযোগ পেট্রোবাংলা করে দিতে পারবে যাতে আমরা শুধুই পাবো আমাদের অংশের অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২০ শতাংশের মূল্য, তেল-গ্যাস কিছুই পাবো না। এটা সহজবোধ্য যে, চুক্তি অনুসারে কনোকোফিলিপসকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ১২ বছর সময় দেয়া হয়েছে আর তাল্লোকে দেয়া হয়েছে ১১ বছর। আমরা যদি পরিবহন করে কূলে আনতে পারতাম তাও বর্তমান গ্যাস বিদু্যৎ সংকট নিরসনে কাজে লাগত না। প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন সমুদ্রের তেল-গ্যাস উত্তোলন না করা হলে দেশের উন্নয়ন হবে কিভাবে ? প্রধানমন্ত্রী এই সত্য লুকাচ্ছেন যে, এই তেল-গ্যাস আমাদের জন্য নয় বহুজাতিক কোম্পানীর জন্য। তা আবার আমাদের রিজার্ভ নিঃশেষ করে। প্রধানমন্ত্রীর অভয়বানী একটি ভাওতামাত্র। সংসদীয় কমিটির সঙ্গে আমাদের আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে, এটিও লোক দেখানো। কারণ একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানীদ্বয়ের সঙ্গে অতিদ্রুত চুক্তি করার জন্যে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এই চুক্তির কারণে আমরা পরবর্তি প্রজন্মের কাছে অপরাধী হয়ে যাবো। আরেকটি বড় ষড়যন্ত্র হচ্ছে আমাদের ন্যায্য সমুদ্রসীমার উপর আমাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট উদ্যম ও তৎপরতা নেওয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রতিবেশী দেশ এই ৩টি ব্লকের কোন অংশের আপত্তি জানালে আমরা কোন বিরোধে জড়াবো না, অনাপত্তি অংশেই দখল রাখব। এই কথা প্রতিবেশীদেশদ্বয়ের কাছে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার শামিল। সম্ভবত আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের চাপে সরকার এই সুশীল নীতি গ্রহণ করেছে যাতে আমাদের ৩টি ব্লকে আমেরিকান ও আইরিশ কোম্পানী দখল নেবার পর পাশর্্ববর্তী সকল ব্লকে আমেরিকার বন্ধু ভারতীয় কোম্পানী বা সরাসরি আমেরিকান কোম্পানী বসে যাবে। ফলে বঙ্গোপসাগর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলনের নামে মার্কিন নৌ-বহরের ঘাটি হয়ে যেতে পারে। আমাদের দাবি ঃ বর্তমান মডেল পিএসসি ২০০৮ বাতিল করতে হবে। এই মডেলের ভিত্তিতে দুটি বহুজাতিক কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন থেকে বিরত হবে, বা হয়ে গেলে তা বাতিল করতে হবে। এই চুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে জনমত যাচাইয়ের জন্যে দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠান করতে হবে ও এই গণভোটের ফলাফল জানার আগে চুক্তি সম্পাদন ক্রিয়া স্থগিত করতে হবে। নতুন নীতিমালার মডেলে সমুদ্রবক্ষের তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্যে জরুরী উদ্যোগ নিতে হবে। সেই নতুল মডেলে থাকবে, তেল-গ্যাসের উপর বাংলাদেশের শতভাগ মালিকানার শর্ত। কন্ট্রাক্টর অনুসন্ধান, বিফলতার ঝুঁকি গ্রহণ, উত্তোলন, পরিবহন সবকিছু করতে বাধ্য থাকবে ও তদনুসারে তাদের সকল ব্যয় ও ঝুঁকি-সংস্থান ও ন্যায্য মুনাফা স্থির করে মোট দর দেবেন। স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টেন্ডারে যে দাতার দর সর্বাপেক্ষা অনুকুলে থাকবে তার দর গ্রহণ করা হবে। প্রতিযোগিতা, ব্যয় পূরণ + মুনাফা এর ভিত্তিতেও হতে পারে। আমাদের দাবির মধ্যে আরও ঃ ফুলবাড়ি ৬ দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেঙ্ ও পেট্রোবাংলাকে দ্রুত দুনর্ীতিমুক্ত করতে হবে ও তাদের কারিগরী ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। মতিন পাটোয়ারী কৃত কয়লা নীতি রিপোর্ট কোন সংশোধন ব্যতিরেকে অবিলম্বে অনুমোদন ও গ্রহণ করতে হবে এবং জরুরীভিত্তিতে সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে অথর্াৎ পানি, মানুষসহ পরিবেশের ন্যুনতম ক্ষতির বিনিময়ে কয়লা উত্তোলন করে' জরুরীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে (৪ বছরের মধ্যেই যা সম্ভব)।